খুলনা গেজেট নিজেই তার তুলনা

আসাফুর রহমান কাজল

খুলনা-শিল্পনগরী হিসেবে যার পরিচিতি বহু পুরোনো, সেই শহরের মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ-দুঃখ, আন্দোলন-সংগ্রাম আর নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। একসময় খুলনার মানুষের মুখে মুখে ফিরত বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক পত্রিকার নাম। খবর জানার আগ্রহে সকালবেলা চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, বাজার কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর, সবখানেই সংবাদপত্র ছিল আলোচনার অন্যতম অনুষঙ্গ।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস। বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে সংবাদ পরিবেশনের ধরন। পাঠক এখন শুধু খবর পড়তে চান না; তাঁরা দ্রুত, নির্ভুল, সহজবোধ্য ও আধুনিক উপস্থাপনায় খবর পেতে চান। এই পরিবর্তনের সময়েই খুলনার সংবাদাঙ্গনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভাব ঘটে খুলনা গেজেটের।

প্রথমে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যাত্রা শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকের নজর কাড়ে খুলনা গেজেট। প্রচলিত সংবাদ পরিবেশনের বাইরে আধুনিক উপস্থাপনা, সময়োপযোগী বিষয় নির্বাচন এবং দ্রুত সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তৈরি হয় নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী। খুলনার মানুষের কাছে এটি হয়ে ওঠে পরিচিত একটি সংবাদমাধ্যম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনলাইন অঙ্গনে খুলনা গেজেটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।

তবে অনলাইনেই থেমে থাকেনি সেই পথচলা। পাঠকের সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে খুলনা গেজেট প্রবেশ করে প্রিন্ট মাধ্যমে। এখানেই শুরু হয় আরও একটি নতুন অধ্যায়। খুলনার সংবাদপত্রের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন আঙ্গিক ও পরিকল্পনায় প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটি। চার পাতা, চার রঙের আধুনিক প্রিন্ট সংস্করণকে সামনে রেখে তৈরি হয় নতুন এক সংবাদপত্রের অভিজ্ঞতা।

খুলনায় চার পাতা চার রঙের পত্রিকার উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। অতীতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সেই বাস্তবতায় খুলনা গেজেটের প্রিন্ট সংস্করণের নিয়মিত পথচলা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সীমিত পরিসরের মধ্যে আধুনিক সংবাদ উপস্থাপনা, নান্দনিকতা এবং পাঠকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা পত্রিকাটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

এর পেছনে রয়েছে একদল উদ্যোগী গণমাধ্যমকর্মীর নিরলস শ্রম। একটি সংবাদপত্র শুধু কাগজ, মুদ্রণযন্ত্র কিংবা সংবাদে তৈরি হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম, দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব এবং পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদক থেকে শুরু করে সম্পাদনা বিভাগ, ফটোসাংবাদিক, ডিজাইন ও মুদ্রণকর্মী, প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি সংবাদমাধ্যম পাঠকের আস্থা অর্জন করে। খুলনা গেজেটের পথচলায়ও রয়েছে এমনই একদল কর্মীর প্রতিদিনের পরিশ্রম।

তাঁদের লক্ষ্য কেবল অন্য পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়; বরং নিজেদের কাজকে প্রতিদিন আরও উন্নত করা। এ কারণেই হয়তো খুলনা গেজেটের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো সংবাদপত্র নয়- খুলনা গেজেট নিজেই।

নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার এই মানসিকতাই একটি সংবাদমাধ্যমকে এগিয়ে নিতে পারে। আজ যে উপস্থাপনা পাঠকের ভালো লাগছে, আগামীকাল সেটিকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা, আজ যে বিষয়টি পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, আগামী দিনে তার আরও গভীরে যাওয়ার প্রত্যয়, এই ধারাবাহিকতাই সংবাদমাধ্যমের বিকাশের পথ তৈরি করে।

পাঠকের প্রতিক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি তার পাঠক। পাঠক যখন একটি পত্রিকাকে গ্রহণ করেন, নিয়মিত পড়েন, আলোচনা করেন কিংবা নিজেদের প্রত্যাশা ও মতামত জানান, তখন সেই সংবাদমাধ্যমের সামনে আরও ভালো করার দায় তৈরি হয়। খুলনা গেজেটের ক্ষেত্রেও পাঠকের এই আগ্রহ ও গ্রহণযোগ্যতা নতুন করে পথ চলার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় যেন তথ্যের নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, জনপ্রিয়তার আকাক্সক্ষায় যেন বস্তুনিষ্ঠতা বিসর্জন না যায়, এই জায়গাগুলোই ভবিষ্যতে খুলনা গেজেটের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে স্থানীয় মানুষের কথা বলা, প্রান্তিক মানুষের সমস্যাকে সামনে আনা এবং খুলনার সম্ভাবনা ও সাফল্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলো ধরে রাখাই হতে পারে দীর্ঘ পথচলার মূল শক্তি।

খুলনার সংবাদপত্রের ইতিহাসে সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তন এসেছে। পাঠকের হাতে থাকা কাগজের আকার বদলেছে, সংবাদ উপস্থাপনের ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি, মানুষের সত্য ও প্রয়োজনীয় খবর জানার আকাঙ্খা।

সেই আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে খুলনা গেজেটের পথচলা এখন নতুন এক অধ্যায়ের গল্প। অনলাইন থেকে প্রিন্ট, প্রচলিত ধারা থেকে নতুন আঙ্গিক, সীমিত পরিসর থেকে আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজ, প্রতিটি ধাপেই রয়েছে পরিবর্তনের চেষ্টা।

শিল্পনগরী খুলনার সংবাদজগতে তাই খুলনা গেজেট শুধু আরেকটি পত্রিকার নাম নয়, এটি একটি চলমান উদ্যোগের নাম। এমন একটি উদ্যোগ, যার সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য অন্যকে পেছনে ফেলা নয়, বরং প্রতিদিন নিজের গতকালের অবস্থানকে অতিক্রম করা।

আর এই জায়গাতেই খুলনা গেজেটের সবচেয়ে বড় পরিচয়, খুলনা গেজেট নিজেই তার তুলনা। নতুন দিনের পাঠক কতটা নতুন কিছু চান, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই এগিয়ে চলুক পত্রিকাটি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মানুষের পাশে থেকে, সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা ও বস্তুনিষ্ঠতাকে ধারণ করে আরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক খুলনা গেজেট- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন